নয়াদিল্লি: জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় যখন বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল ভারত। বিগত ১২ বছরে সুনির্দিষ্ট নীতি নির্ধারণ এবং তার সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে এক অভূতপূর্ব ভারতের সবুজ রূপান্তর বা India's Green Transformation সম্পন্ন হয়েছে। পেশাদার সাংবাদিকতার নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই রূপান্তরের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনটি স্তম্ভের ওপর— ‘বিশ্বাস, নির্মাণ এবং জনকল্যাণ’। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেও কীভাবে পরিবেশের সামগ্রিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, ভারত আজ বিশ্বমঞ্চে তারই এক সফল প্রতিচ্ছবি।
কেন্দ্রীয় সরকার সুত্রে পাওয়া সাম্প্রতিকতম প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বনাঞ্চল বৃদ্ধি, নদী পুনরুজ্জীবন, এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত নিরাপত্তা শুধুমাত্র দেশের ভেতরের ইকোসিস্টেমকেই শক্তিশালী করেনি, বরং আন্তর্জাতিক স্তরেও ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভারতের সবুজ রূপান্তর ও বনাঞ্চলের অভাবনীয় বৃদ্ধি
ইন্ডিয়া স্টেট অব ফরেস্ট রিপোর্ট (ISFR) ২০২৩-এর পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলে এই সাফল্যের খতিয়ান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে ভারতের মোট বন ও বৃক্ষাচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮.২৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারে, যা দেশের মোট ভৌগোলিক আয়তনের ২৫.১৭ শতাংশ। এর মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে বনভূমি ২১.৭৬ শতাংশ এবং বৃক্ষাচ্ছাদিত এলাকা ৩.৪১ শতাংশ।এই বিশাল বনাঞ্চল বর্তমানে ৩০.৪৩ বিলিয়ন টন কার্বন স্টক ধরে রাখতে সক্ষম, যা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের অন্যতম বড় হাতিয়ার। এছাড়া ২০১৪ সালে শুরু হওয়া ‘এক পেড মা কে নাম’ (Ek Ped Maa Ke Naam) অভিযানের আওতায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৬২.৪ কোটিরও বেশি চারা রোপণ করা হয়েছে, যা এই আন্দোলনকে একটি গণআন্দোলনে রূপ দিয়েছে।
নমামি গঙ্গে এবং নদী অববাহিকার পুনরুজ্জীবন
জল দূষণ প্রতিরোধ এবং নদীর বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে ২০১৪ সালের জুন মাসে চালু হয়েছিল ফ্ল্যাগশিপ মিশন ‘নমামি গঙ্গে’। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্পের অধীনে ৪৩,০৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫২৪টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৫৫টি ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য দেখা গেছে শিল্পজাত বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে। ২০১৭ সালে যেখানে গঙ্গায় বায়ো-কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (BOD) বা শিল্পজাত দূষণের মাত্রা ছিল প্রতিদিন ২৬ টন (26 TPD), ২০২৪ সালে তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০.৭৫ টনে (10.75 TPD)। নদী পরিষ্কার হওয়ার পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে জলজ জীববৈচিত্র্যও। সমীক্ষায় গঙ্গা অববাহিকায় ৩,০৩৭টি ঘড়িয়াল এবং ৮,৫০৭ কিলোমিটার নদী এলাকা জুড়ে প্রায় ৬,৩২৭টি গাঙ্গেয় ডলফিনের উপস্থিতি নথিভুক্ত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রামসার সাইটের তালিকায় ভারতের জয়যাত্রা
আর্দ্রভূমি বা জলাভূমিকে পৃথিবীর ফুসফুস বলা চলে। ২০১৩ সালে ‘ন্যাশনাল প্ল্যান ফর কনজারভেশন অব অ্যাকুয়াটিক ইকোসিস্টেম’ (NPCA) চালুর পর থেকে জলাভূমি সংরক্ষণে ভারত অভূতপূর্ব গতি পেয়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে ভারতে আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন ‘রামসার সাইট’ (Ramsar Sites) ছিল মাত্র ২৬টি, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে সেই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯টিতে।
একইভাবে সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের সুরক্ষায় ‘মিষ্টি’ (MISHTI) প্রকল্পের মাধ্যমে ম্যানগ্রোভ অরণ্য পুনর্নির্মাণের কাজ ত্বরান্বিত হয়েছে। ফলে ২০১৩ সালের ৪,৬২৮ বর্গ কিমির ম্যানগ্রোভ এলাকা ২০২৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৪,৯৯২ বর্গ কিমিতে পৌঁছেছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রজাতি রক্ষা
যুগান্তকারী এই ভারতের সবুজ রূপান্তর প্রক্রিয়ায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এক সোনালী অধ্যায় যোগ করেছে।
প্রজেক্ট টাইগার: অল ইন্ডিয়া টাইগার এস্টিমেশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৪ সালে দেশে বাঘের সংখ্যা যেখানে ছিল ২,২২৬টি, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,৬৮২টিতে। ভারত এখন বিশ্বের মোট বাঘের ৭০ শতাংশেরই আশ্রয়স্থল।
প্রজেক্ট চিতাবাঘ: ২০১৮ সালের ১২,৮৫২টি চিতাবাঘের সংখ্যা ২০২২ সালের গণনায় বেড়ে হয়েছে ১৩,৮৭৪টি।
প্রজেক্ট লায়ন ও চিতা: এশিয়াটিক লায়নের সংখ্যা ২০১৫ সালের ৫২৩ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৮৯১ ছুঁয়েছে। পাশাপাশি আফ্রিকান মহাদেশ থেকে চিতা এনে মধ্য ভারতের চারণভূমিতে পুনর্বাসনের ঐতিহাসিক পদক্ষেপের পর দেশে এখন চিতার সংখ্যা ৫৩টি।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি
২০১৪ সালে ভারতে উৎপাদিত কঠিন বর্জ্যের মাত্র ১৭ শতাংশ বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াকরণ করা হতো। ২০২৪ সালের খতিয়ান বলছে, সেই প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭ শতাংশে। ‘এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপন্সিবিলিটি’ (EPR) কাঠামোর মাধ্যমে প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য, ব্যাটারি এবং পুরনো টায়ার রিসাইক্লিংয়ের ক্ষেত্রে উৎপাদকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত দেশে ৪,৫৭৪টি নিবন্ধিত রিসাইক্লিং ইউনিটের মাধ্যমে প্রায় ৪১৭.৫৭ লক্ষ মেট্রিক টন বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা সম্ভব হয়েছে।
বিশ্বমঞ্চে ভারতের পরিবেশ কূটনীতি ও জলবায়ু নেতৃত্ব
ভারত কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেই পরিবেশ রক্ষা করছে না, বরং গ্লোবাল সাউথ তথা সমগ্র বিশ্বের জলবায়ু আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্যারিস চুক্তির আওতায় নির্ধারিত নির্গমন তীব্রতা (Emissions Intensity) ৩৩-৩৫ শতাংশ হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা সময়সীমার ১১ বছর আগেই ভারত অর্জন করে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক সৌর জোট (ISA), ওয়ান সান ওয়ান ওয়ার্ল্ড ওয়ান গ্রিড (OSOWOG), মিশন লাইফ (Mission LiFE), এবং ২০২৩ সালের জি-২০ সম্মেলনে গৃহীত ‘গ্রিন ডেভেলপমেন্ট প্যাক্ট’ প্রমাণ করে যে, পরিবেশগত কূটনীতিতে ভারত আজ অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ‘বিকাশ’ এবং ‘পরিবেশ সুরক্ষা’ যে একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, ১২ বছরের এই খতিয়ান তারই অকাট্য প্রমাণ। ‘বিকশিত ভারত’-এর পথ যে টেকসই উন্নয়নের হাত ধরেই এগোচ্ছে, তা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।





