নয়াদিল্লি, ৩০ মে ২০২৬: ভারতীয় কৃষিক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হলো । দেশের ২২টি রাজ্যের কৃষি মন্ত্রীরা এবার দিল্লির ঐতিহ্যবাহী পুসা ক্যাম্পাসে আয়োজিত দু-দিনের 'জাতীয় খরিফ সম্মেলন ২০২৬' (National Kharif Conference 2026)-এর মঞ্চে একত্রিত হয়েছেন । গত ২৮ ও ২৯ মে অনুষ্ঠিত এই মেগা সম্মেলনে শুধুমাত্র রুটিন প্রশাসনিক আলোচনা বা পর্যালোচনা নয়, বরং দেশের কৃষকদের ভাগ্যবদল এবং সামগ্রিক কৃষি ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে এক যৌথ রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে । কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের সভাপতিত্বে এই সম্মেলনের সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল 'ক্ষেত বাঁচাও অভিযান'

কর্মকর্তাদের সাথে সাধারণ আসনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী

সম্মেলনের প্রথম দিন থেকেই এক ভিন্ন ইতিবাচক পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান নিজের উদ্বোধনী বক্তব্য শেষ করে কোনো বিশেষ মঞ্চে না বসে, হলের একদম শেষ সারিতে গিয়ে সাধারণ প্রতিনিধিদের সাথে বসে দীর্ঘ আলোচনা শোনেন । কর্মকর্তাদের গুরুত্ব দিতে এবং তাঁদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে সরাসরি অনুধাবন করতেই তাঁর এই পদক্ষেপ । দ্বিতীয় দিনে রাজ্যগুলোর কৃষি মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে এই আলোচনা এক চূড়ান্ত নীতিগত অঙ্গীকারের রূপ নেয় ।

ক্ষেত বাঁচাও অভিযান: ভবিষ্যৎ সুরক্ষার নতুন জাতীয় মিশন

"ক্ষেত বাঁচানো মানেই দেশের ভবিষ্যৎ বাঁচানো"— এই স্লোগানকে সামনে রেখেই দেশজুড়ে শুরু হতে চলেছে ক্ষেত বাঁচাও অভিযান । কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, কৃষিজমি রক্ষা করার অর্থ কেবল উৎপাদন বাড়ানো নয়; এটি আমাদের পরিবেশ, মাটি এবং আগামী প্রজন্মকে সুরক্ষিত করার এক জাতীয় দায়িত্ব ।

এই অভিযানের মূল লক্ষ্যগুলো হলো:

ভারসাম্যপূর্ণ সার ব্যবহার: রাসায়নিক সার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা এই অভিযানের উদ্দেশ্য নয়, বরং বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিযুক্ত উপায়ে সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা ।

যৌথ প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস: এই মিশনকে সফল করতে কেন্দ্র, রাজ্য সরকার, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ (ICAR), কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রগুলো (KVK) যৌথভাবে কাজ করবে ।

কন্ট্রোল রুম ও মনিটরিং: অভিযানটিকে কেবল খাতা-কলমে বা আবেদনে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট মনিটরিং সিস্টেম ও ডেডিকেটেড কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হবে ।

নীতি নির্ধারণে দৃষ্টান্ত: নিজেদের জমিতে প্রাকৃতিক চাষ করবেন মন্ত্রীরা

এই সম্মেলনের অন্যতম বড় এবং বাস্তবসম্মত আউটপুট হলো— উপস্থিত ২২টি রাজ্যের কৃষি মন্ত্রীরা কেবল নীতিগত স্তরে নয়, বরং নিজেদের ব্যক্তিগত কৃষিজমিতেও প্রাকৃতিক চাষ (Natural Farming) করার অঙ্গীকার করেছেন । যেহেতু বেশিরভাগ কৃষি মন্ত্রীই ব্যক্তিগতভাবে কৃষিকাজের সাথে যুক্ত, তাই এই সিদ্ধান্ত দেশের সাধারণ কৃষকদের মনে এক বিশাল আত্মবিশ্বাস ও প্রেরণা জোগাবে ।

এই প্রসঙ্গে গুজরাটের রাজ্যপাল আচার্য দেবব্রত সম্মেলনে অংশ নিয়ে গুজরাট মডেলের সফল অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন এবং দেশজুড়ে প্রাকৃতিক চাষের পরিধি বাড়ানোর ওপর জোর দেন ।

ডাল ও তৈলবীজে আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য

খরিফ ২০২৬-এর পরিকল্পনাকে এবার শুধু মৌসুমী প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না । দেশের মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি ডাল (Pulses) ও তৈলবীজ (Oilseeds) উৎপাদনে ভারতকে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভর করে তোলা এবং চাষের খরচ কমিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই এই নতুন কৃষি দর্শনের মূল লক্ষ্য ।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান সমস্ত রাজ্য সরকারকে প্রশাসনিক জটিলতা ও লাল ফিতের ফাঁস সহজ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে কৃষকরা সরাসরি সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারেন । সম্মেলন শেষে সমস্ত মন্ত্রী ও পদস্থ কর্মকর্তারা দেশের এই নতুন কৃষি মিশনকে সফল করতে একযোগে কাজ করার যৌথ শপথ গ্রহণ করেন । 'ক্ষেত বাঁচাও অভিযান' এবং প্রাকৃতিক চাষের এই সমন্বিত রূপরেখা আগামী দিনে ভারতের কৃষি অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের মাইলফলক হতে চলেছে ।

Democratic Indians Premium