বিশেষ প্রতিনিধি, দিল্লি: মহাবিশ্বের গহীন অন্ধকারের রহস্যভেদে এবার বড়সড় সাফল্যের দাবি করলেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা । আমরা জানি, বিশালাকার গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অতিভুজাকৃতি ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর থাকে। কিন্তু আমাদের আকাশগঙ্গার চারপাশে থাকা অতি ক্ষুদ্র এবং অত্যন্ত অনুজ্জ্বল 'বামন উপবৃত্তাকার' (Dwarf Spheroidal) গ্যালাক্সিগুলোতেও কি ব্ল্যাক হোল থাকা সম্ভব? তা নিয়ে গবেষনা চলছিলই। এবার সেই কঠিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের (IIA) বিজ্ঞানীরা এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছেন ।
ভারতীয় বিজ্ঞানীদের নতুন ডাইনামিকাল মডেল (Dynamic Models)
সম্প্রতি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের বিজ্ঞানী কে. আদিত্য এবং অরুণ মাঙ্গলম এই গবেষণাটি সম্পন্ন করেছেন । তারা অত্যন্ত ঝাপসা এবং গ্যাসবিহীন বামন গ্যালাক্সিগুলোর ওপর নজর দিয়েছিলেন, যেখানে সরাসরি ব্ল্যাক হোল শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব । বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের গতিবিধির ওপর ভিত্তি করে বিশেষ 'ডাইনামিকাল মডেল' তৈরি করেছেন, যা এই গ্যালাক্সিগুলোর অভ্যন্তরীণ নক্ষত্র, ডার্ক ম্যাটার এবং সম্ভাব্য ব্ল্যাক হোলের ভর পরিমাপ করতে সক্ষম ।
মাঝারি ভরের ব্ল্যাক হোল বা Intermediate-mass Black Holes
গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই বামন গ্যালাক্সিগুলোতে অতি দানবীয় ব্ল্যাক হোল না থাকলেও ১০ লক্ষ সৌর ভরের নিচে মাঝারি মানের বা 'ইন্টারমিডিয়েট-মাস' ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে । বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের বেগের বিচ্ছুরণ (Stellar Velocity Dispersion) এবং ব্ল্যাক হোলের ভরের মধ্যে একটি অভিন্ন সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন । এটি প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম গ্যালাক্সি থেকে শুরু করে বৃহত্তম গ্যালাক্সি পর্যন্ত ব্ল্যাক হোল তৈরির এই গাণিতিক নিয়মটি একইভাবে কার্যকর ।
মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ এবং ভারতের NLOT প্রকল্প
এই আবিষ্কারটি ভবিষ্যতে গ্যালাক্সি এবং ব্ল্যাক হোলের বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে কাজ করবে । অরুণ মাঙ্গলমের মতে, এই গবেষণাটি বিশেষ সময়োপযোগী কারণ ভারত শীঘ্রই ‘ন্যাশনাল লার্জ অপটিক্যাল টেলিস্কোপ’ (NLOT) এবং 'এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ' (ELT) এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করতে যাচ্ছে । এই শক্তিশালী টেলিস্কোপগুলোর সাহায্যে মহাকাশের এই ঝাপসা গ্যালাক্সিগুলোর রহস্য আরও নিঁখুতভাবে সমাধান করা সম্ভব হবে ।
গ্যালাক্সি বিবর্তন এবং আদিম ব্ল্যাক হোল বীজের অনুসন্ধান
বিজ্ঞানীদের এই বিশেষ গবেষণাটি মহাবিশ্বের আদিম অবস্থা সম্পর্কে নতুন তথ্য প্রদান করতে পারে । গবেষকরা মনে করছেন, বামন গ্যালাক্সিগুলোতে প্রাপ্ত এই মাঝারি ভরের ব্ল্যাক হোলগুলো আসলে 'প্রাইমর্ডিয়াল ব্ল্যাক হোল সিডস' বা আদিম ব্ল্যাক হোলের বীজ হতে পারে, যা থেকে কালক্রমে বিশাল ব্ল্যাক হোল তৈরি হয়েছে । গ্যাস সঞ্চয়ন (Gas Accretion) এবং নক্ষত্র ক্যাপচার (Stellar Capture) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ব্ল্যাক হোলগুলো কীভাবে বৃদ্ধি পায়, তার একটি স্পষ্ট গাণিতিক পূর্বাভাসও এই গবেষণায় দেওয়া হয়েছে । ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের এই কাজ ভবিষ্যতে মহাকাশ বিজ্ঞানের জটিল সিমুলেশন এবং গ্যালাক্সি বিবর্তনের তত্ত্বগুলোকে আরও নিখুঁত করতে সহায়তা করবে ।





