ভারতের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও আইনি ইতিহাসে এক মাইলফলক তৈরি হলো। দীর্ঘ ১৭ বছরের নিরলস তদন্ত ও আইনি লড়াইয়ের পর, বিলুপ্তপ্রায় তিব্বতি অ্যান্টিলোপ বা ‘চিরু’-র লোম দিয়ে তৈরি অবৈধ শাহতুশ পাচার মামলা-য় (Shahtoosh smuggling case) সাজা ঘোষণা করল দিল্লির আদালত । জয়পুরের এক বিখ্যাত আর্ট গ্যালারি মালিককে এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে । বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ব্যুরো (WCCB) এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (CBI)-এর যৌথ প্রচেষ্টায়ই এই সাফল্য এসেছে, যা দেশের বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় এক বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে ।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: ২০০৮ সালের সেই অভিযান
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে 。 দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রপ্তানির জন্য রাখা একটি চালানে ১,২৯০টি শালের সন্ধান পায় WCCB । সন্দেহ হওয়ায় তৎকালীন রিজিওনাল ডেপুটি ডিরেক্টর রমেশ কুমার পান্ডের নির্দেশে ইন্সপেক্টর আরতি সিং চালানটি পরীক্ষা করেন । প্রাথমিক পরীক্ষায় মনে করা হয়, এর মধ্যে অত্যন্ত মূল্যবান ও নিষিদ্ধ শাহতুশ তন্তু মেশানো রয়েছে ।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই বিষয়টি নিয়ে সিবিআই-এর ইকোনমিক অফেন্স উইং (EOU-V) শাখায় অভিযোগ দায়ের করা হয় । উল্লেখ্য, এটিই ছিল ভারতে কোনো বন্যপ্রাণী অপরাধের (Wildlife offence) ক্ষেত্রে সিবিআই-এর প্রথম মামলা পরিচালনা ।
বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও ফরেনসিক তদন্তের ভূমিকা
এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ফরেনসিক প্রমাণ। দেরাদুনের ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (WII) জব্দ করা শালের তন্তু পরীক্ষা করে । তাদের রিপোর্টে নিশ্চিত করা হয় যে, ৪১টি শালে তিব্বতি অ্যান্টিলোপের (Pantholops hodgsonii) লোম বা শাহতুশ ফাইবার ব্যবহার করা হয়েছে । আদালতের শুনানিতে ডব্লিউআইআই-এর বিজ্ঞানী ড. এস.পি. গোয়েল বিশেষজ্ঞ সাক্ষী হিসেবে বৈজ্ঞানিক তথ্য পেশ করেন, যা আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে প্রধান ভূমিকা নেয় 。
কেন নিষিদ্ধ এই শাহতুশ বাণিজ্য?
তিব্বতি অ্যান্টিলোপ বা ‘চিরু’ ভারতের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন, ১৯৭২-এর ১ নম্বর তফশিলের (Schedule I) অন্তর্ভুক্ত একটি অতি বিপন্ন প্রাণী । এদের হত্যা করে লোম সংগ্রহ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ । এ ছাড়া, ১৯৭৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক কনভেনশন (CITES)-এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী শাহতুশ বাণিজ্যে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, ভারতও যার অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ ।
আদালতের রায় ও কঠোর সাজা
জয়পুরের ‘মেসার্স ইন্ডিয়ান আর্ট গ্যালারি’-র স্বত্বাধিকারী সৈয়দ শাহিদ আহমেদ কাসানি দাবি করেছিলেন যে, তিনি কেবল মেশিন-মেড পশমিনা শাল রপ্তানি করছিলেন এবং তিনি নির্দোষ 。 তবে দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ জেলা আদালতের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসামির সমস্ত যুক্তি খারিজ করে দেন । ১২ মার্চ ২০২৬-এ আদালত রায় দেয় যে, আসামির আচরণ এবং প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণ তার অপরাধকেই নির্দেশ করে 。আসামিকে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনের ধারা অনুযায়ী ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০,০০০ টাকা জরিমানা করা হয় । আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, জব্দ করা সমস্ত শাহতুশ শাল এখন থেকে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে ।
উপসংহার
এই মামলাটি প্রমাণ করে যে, বন্যপ্রাণী অপরাধ দমনে ভারতের তদন্তকারী সংস্থাগুলো কতটা কঠোর এবং দীর্ঘস্থায়ী সমন্বয় বজায় রাখতে সক্ষম । দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে কাস্টমস, সিবিআই, ডব্লিউসিসিবি এবং ডব্লিউআইআই-এর যৌথ কর্মতৎপরতা পরিবেশ কর্মীদের মনে আশার আলো জাগিয়েছে । গণতান্ত্রিক ভারতের সচেতন নাগরিক হিসেবে বন্যপ্রাণী রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা আমাদের জাতীয় কর্তব্যের অংশ।





