DI: বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে মাছের যোগান ও চাহিদার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সামনে আসে। ভারত সরকারের মৎস্য পালন ও দুগ্ধজাত মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গ বার্ষিক প্রায় ২০.৫ লক্ষ থেকে ২১ লক্ষ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন করে দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে। কিন্তু এই সাফল্যের উজ্জ্বল ছবির আড়ালে রয়ে গেছে একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন। কেন উৎপাদনে শীর্ষ সারিতে থেকেও বিশ্ববাজারে রপ্তানি আয়ের লড়াইয়ে বাংলা পিছিয়ে পড়ছে?

কেন্দ্রীয় রিপোর্ট ও অন্ধ্রপ্রদেশ মডেলের তুলনা

কেন্দ্রীয় সরকারের 'প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনা' (PMMSY) সংক্রান্ত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, অন্ধ্রপ্রদেশ জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ২৪ শতাংশ দখল করে যেমন শীর্ষে রয়েছে, তেমনি দেশের মোট মাছ রপ্তানি আয়ের ৩৬ শতাংশই তাদের পকেটে যাচ্ছে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় উৎপাদনের অংশ ১৫.৫ শতাংশ হলেও রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।

কেন্দ্রীয় আধিকারিকদের মতে, অন্ধ্রপ্রদেশ মূলত উচ্চমূল্যের ভেনামি চিংড়ি (Vannamei Shrimp) এবং উন্নত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ওপর জোর দিয়েছে যা আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিপরীতে, পশ্চিমবঙ্গে মাছের যোগান মূলত মিষ্টি জলের মাছ যেমন রুই, কাতলা বা মৃগেলের ওপর নির্ভরশীল, যার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনেক কম।

পরিকাঠামোগত অভাব ও ভ্যালু অ্যাডিশনের চ্যালেঞ্জ

কেন্দ্রীয় সরকারের একটি প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে 'ভ্যালু অ্যাডিশন' বা মাছ প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের অভাব রয়েছে। এ রাজ্যে উৎপাদিত মাছের সিংহভাগই স্থানীয় বাজারে ব্যবহৃত হয়ে যায়। ফলে মাছকে প্রক্রিয়াকরণ করে বিদেশে পাঠানোর মতো আধুনিক কোল্ড চেন বা প্রসেসিং ইউনিটের সংখ্যা এখানে চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় মৎস্য মন্ত্রকের অভিযোগ, রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারায় মৎস্যজীবীরা সরাসরি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার আধুনিক প্রযুক্তি এবং ট্রলারের ব্যবহারে পশ্চিমবঙ্গ এখনও প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গের মৎস্য খাতের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাবনা

যদিও মিষ্টি জলের মাছ উৎপাদনে বাংলা এক শক্তিশালী শক্তি, তবুও ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিশ্ববাজার ধরতে গেলে নীল বিপ্লব বা 'Blue Economy'-তে আরও সক্রিয় হতে হবে। কেন্দ্রীয় রিপোর্টে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গ যদি ভেনামি চিংড়ি এবং লোনা জলের মাছ চাষে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে পারে, তবে আগামী কয়েক বছরে রপ্তানি আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব।

এক অভিজ্ঞ সাংবাদিকের কলমে এটি স্পষ্ট যে, কেবল উৎপাদনের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য বিচার করলে চলবে না। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের যৌথ সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।

Democratic Indians Premium