কেন্দ্রের Make In India ও 'মেডিকেল ডিভাইস পলিসি'-র হাত ধরে এ রাজ্যে এবার চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন শিল্পে এক বিরাট পদক্ষেপ ফেলতে চলেছে SI Surgical. হাওড়ার চামরাইলে সংস্থার একটি কারখানার পর এবার প্রায় সাড়ে পাঁচ একর জমির ওপর সংস্থার আরেকটি নতুন উচ্চাভিলাষী কারখানা প্রকল্পের ভুমি পূজন হতে চলেছে আগামী ২৬ শে সেপ্টেম্বর। ফলে হাওড়ার শিল্প মানচিত্রে যুক্ত হতে চলেছে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। রাজ্যের নয়া সরকারের ক্রমবর্ধমান শিল্পবান্ধব পরিবেশে SI Surgical এর শূন্য থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলার বুকে এই বিশাল বিনিয়োগ কেবল কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্তই উন্মোচন করবে না, বরং পূর্ব ভারতকে ভারতের অন্যতম প্রধান মেডিকেল হাব হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করবে।
নতুন প্রকল্পের বিশেষ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থানের হাতছানি
কেন্দ্রের Skill India র নীতি মেনে, বাংলায় এই প্রকল্পের সব থেকে নজরকাড়া দিকটি হল Skill Development Academy । কাজের সুযোগ তৈরি করাই নয়, কারিগরি শিক্ষার অভাব দূর করতে এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকছে একটি বিশেষ দক্ষতা উন্নয়ন অ্যাকাডেমি (Skill Development Academy)।
এর ফলে হাওড়া তথা পশ্চিমবঙ্গের তরুণ প্রজন্ম এই শিল্প জগতের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের উপযুক্ত করে তুলতে পারবেন। এছাড়া ভবিষ্যতে এই কারখানায় রেডিয়োলজি সরঞ্জাম এবং নিয়মিত ব্যবহৃত ডিসপোজেবল চিকিৎসাসামগ্রী তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে, যার মূল লক্ষ্য উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম আরও কম খরচে সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে দেওয়া।
নতুন এই সাড়ে পাঁচ একর জমির প্রকল্পটি কেবল একটি সাধারণ কারখানা নয়; এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ডিভাইস পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ছোট ব্যবসা থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি: সাফল্যের অনন্য রূপকথা
আজকের এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও শ্রী সঞ্জয় মুখার্জির প্রায় দুই দশকের নিরলস সংগ্রাম ও অধ্যাবসায়। ২০০৬ সালে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া মাত্র সাত হাজার টাকা এবং মোটে ৪০ বর্গফুটের একটি ছোট অফিস ঘর নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি। প্রথমে চিকিৎসা সরঞ্জামের কেনাবেচা দিয়ে শুরু হলেও, পরবর্তীকালে পূর্ব ভারতে এই শিল্পের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ২০১২ সালে সরাসরি উৎপাদনে প্রবেশ করেন তিনি।
বর্তমানে হাওড়ার চামরাইলে সংস্থাটির প্রায় এক লক্ষ বর্গফুটের একটি কারখানা এবং ১০ হাজার বর্গফুটের গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) পরিকাঠামো রয়েছে। অপারেশন টেবিল, অত্যাধুনিক অস্ত্রোপচারের আলো এবং মডুলার অপারেশন থিয়েটারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরিতে ইতিমধ্যেই মুন্সিয়ানা দেখিয়েছে SI Surgical। শুধু দেশের গণ্ডিই নয়, দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক দপ্তর এবং ইথিওপিয়ায় উৎপাদন উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতের বাইরে প্রায় ৩২টি দেশে পৌঁছে গেছে এই বাংলার সংস্থার তৈরি জীবনদায়ী চিকিৎসা সরঞ্জাম।
বিশাল বাজার ও সম্প্রসারণের রোডম্যাপ
দেশের দ্রুত বর্ধনশীল চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্ষেত্রকে নজরে রেখেই এই বড়সড় বাজি ধরেছে বাংলার এই সংস্থা। বর্তমানে ভারতের মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট সেক্টরের বাজারমূল্য প্রায় ১৫ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলার, যা ১৬ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে (CAGR) বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিশাল সম্ভাবনাময় বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতেই হাওড়ার চামরাইলে অবস্থিত বর্তমান এক লক্ষ বর্গফুটের উৎপাদন ইউনিট এবং ১০ হাজার বর্গফুটের গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কেন্দ্রের পাশেই প্রায় ৫.৫ একর জমির ওপর এই নতুন বৃহত্তর কারখানাটি গড়ে তোলা হচ্ছে ।
রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের বাণিজ্যিক পদক্ষেপ এবং বাংলার পুনরুত্থান
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কেন্দ্র সরকারের 'ন্যাশনাল মেডিকেল ডিভাইস পলিসি' এবং স্বাস্থ্যখাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর নীতি দেশের চিকিৎসা সরঞ্জাম শিল্পকে এক বিশাল গতি দিয়েছে। পাশাপাশি, রাজ্য সরকারের 'সিলিকন ভ্যালি', 'বিশ্ব বাংলা বাণিজ্য সম্মেলন' এবং বিভিন্ন শিল্পবান্ধব পলিসির কারণে পশ্চিমবঙ্গে ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME) থেকে শুরু করে বড় বড় ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট গড়ে তোলার পরিবেশ যথেষ্ট অনুকূল হয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের এই দ্বিমুখী বাণিজ্যিক সহযোগিতার ফলেই এসআই সার্জার্জিকেলের মতো সংস্থাগুলি বাংলায় বড় ধরনের লগ্নি করতে উৎসাহিত হচ্ছে।
স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শকে নিজের জীবনের পাথেয় করে চলা উদ্যোক্তা সঞ্জয় মুখার্জির শৈশবের আর্থিক অনটনের দিনগুলি আজ শত শত পরিবারের মুখে হাসি ফোটার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগের নির্দিষ্ট অংক বা নিয়োগের দিনক্ষণ এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও, ২৬ সেপ্টেম্বরের এই ভূমিপুজো যে বাংলার স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও শিল্পায়নকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।





