বিশেষ প্রতিবেদন, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনে পর্যটন শিল্পকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করল রাজ্য সরকার । ২০২২ সালের ২২শে জুন পর্যটন দপ্তরের মাননীয় মন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রকাশিত অফিশিয়াল প্রেস নোটে আগামী ২০২৬-২৭ আর্থিক বছরের জন্য এক দূরদর্শী ও বৈপ্লবিক বাজেটের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে । "ব্র্যান্ড বেঙ্গল"-কে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে এবং আগামী ৩ বছরের মধ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে ৫টি কৌশলগত অগ্রাধিকার বা ‘স্ট্র্যাটেজিক প্রায়োরিটি’ নির্ধারণ করা হয়েছে । এবারের West Bengal Tourism Budget 2026 কেবল একটি আর্থিক খতিয়ান নয়, বরং এটি বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক এবং দায়িত্বশীল পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বাংলাকে গড়ে তোলার এক দৃঢ় অঙ্গীকার ।
৫টি মূল স্তম্ভ এবং বিশ্বমঞ্চে দুর্গোৎসবের বিশ্বায়নরাজ্য সরকারের নতুন পর্যটন নীতি মূলত পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে: ব্র্যান্ড অব বেঙ্গলের পুনর্নির্মাণ, সম্ভাবনা থেকে পারফরম্যান্স, সবার জন্য পর্যটন, প্রাচ্যের প্রবেশদ্বার এবং প্রগতির জন্য অংশীদারিত্ব । এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে "দুর্গাপূজা - বিশ্বজুড়ে বাঙালির আবেগ" স্লোগানকে সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী একটি বড়সড় ব্র্যান্ডিং ক্যাম্পেইন চালু করা হচ্ছে । থিম প্যান্ডেলের জাঁকজমক, ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান এবং লোকশিল্পকে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রচার করতে বিশেষ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও গাইড তৈরি করা হবে, যাতে অনাবাসী বাঙালি এবং বিশ্ব পর্যটকরা সরাসরি যুক্ত হতে পারেন ।
হেরিটেজ সংস্কার ও ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে বড় বরাদ্দরাজ্যের ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোর আমূল সংস্কারের জন্য হেরিটেজ কমিশনকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করা হচ্ছে । এই তালিকায় কালীঘাট মন্দির, তারাপীঠ, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, মদনমোহন মন্দির এবং তারকেশ্বরের মতো প্রধান প্রধান ধর্মীয় স্থানগুলোর জন্য ব্যাপক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে । সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভাষাগত সংরক্ষণের অংশ হিসেবে, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জীরাতে ১২৫ ফুটের এক বিশাল মূর্তি, তাঁর পৈতৃক ভিটের সংস্কার, পার্ক, লাইব্রেরি ও মেমোরিয়াল তৈরির জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে । পাশাপাশি রাজবংশী ও কুড়মালি ভাষা, একাডেমি এবং লোকশিল্পের প্রসারে আরও ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে । কলকাতা শহরকে একটি 'লিভিং হেরিটেজ' এবং রিভারফ্রন্ট ট্যুরিজম ডেস্টিনেশন হিসেবে গড়ে তুলে ইউনেস্কো (UNESCO) স্বীকৃতির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে ।
আধ্যাত্মিক পর্যটনে মেগা প্রজেক্ট: মায়াপুরে ১,০০০ কোটি টাকাWest Bengal Tourism Budget 2026-এর সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি হলো আধ্যাত্মিক পর্যটনের বিকাশ। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর স্মৃতিবিজড়িত মায়াপুরকে বিশ্বমানের আধ্যাত্মিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে আগামী তিন বছরে ১,০০০ কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে । পাশাপাশি রাজ্যের প্রধান শক্তিপীঠগুলোকে (যেমন- ভ্রামরী দেবী, নন্দিকেশ্বরী, বক্রেশ্বর, ফুল্লরা, কঙ্কণীতলা এবং তারাপীঠ) সংযুক্ত করে একটি 'বেঙ্গল শক্তিপীঠ সার্কিট' তৈরি করা হবে । তীর্থযাত্রীদের সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য পুরী এবং দেওঘরে পিপিপি (PPP) মডেলে আবাসন সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্য সরকারের ।
পাহাড় থেকে সমুদ্র: ডুয়ার্স, সুন্দরবন ও দিঘার রূপবদলউত্তরবঙ্গের পর্যটনের রানি দার্জিলিংকে গ্লোবাল মাউন্টেন, ওয়েলনেস এবং অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের কেন্দ্র হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হবে । গ্ল্যাম্পিং পরিকাঠামো, টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখার আধুনিক সুবিধা, রোপওয়ে সংযোগ এবং চা-বাগানের বাংলোগুলোর হেরিটেজ ম্যাপিং করা হবে । পাহাড়ে যানজট কমাতে এবং যোগাযোগ বাড়াতে NH-10 এবং হিল কার্ট রোডের চওড়াকরণসহ মাল্টি-লেভেল পার্কিং তৈরি করা হবে । ডুয়ার্স ও কোচবিহারকে প্রিমিয়ার ওয়াইল্ডলাইফ ডেস্টিনেশন এবং চা পর্যটনের (Tea Tourism) সেরা ঠিকানা হিসেবে গড়ে তোলা হবে । সুন্দরবনের পরিবেশবান্ধব পর্যটনের জন্য একটি সমন্বিত 'ট্যুরিজম মাস্টার প্ল্যান' তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে ইকো-রিসোর্ট, ক্রিক ট্যুরিজম, ভাসমান গ্ল্যাম্পিং এবং ই-ভেসেল বা বৈদ্যুতিক জলযানের ওপর জোর দেওয়া হবে । জঙ্গলমহলের পর্যটন বাড়াতে ঝাড়গ্রাম চিড়িয়াখানায় ১৬০ একর জমিতে একটি টাইগার সাফারি তৈরি করা হবে, যার জন্য ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে । দক্ষিণবঙ্গে দিঘা-মন্দারমণি মেরিন ড্রাইভকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে । অন্যদিকে গঙ্গাসাগর মেলাকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করতে ভারত সরকারের সাথে যৌথ অংশীদারিত্বে কাজ করা হবে । জগদ্ধাত্রী পূজা, রাস মেলা এবং জলপেশ মেলাকে জাতীয় স্তরের উৎসব হিসেবে প্রমোট করা হবে ।
আধুনিক অবকাঠামো, রোপওয়ে এবং আন্তর্জাতিক সংযোগপরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী পর্যটন পরিকাঠামো হিসেবে রাজ্যজুড়ে রোপওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (Techno-feasibility study) জন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে । এছাড়া রাজ্যকে একটি শীর্ষস্থানীয় মেডিকেল ট্যুরিজম হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং পর্যটকদের সুরক্ষায় বড় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা করা হয়েছে । আন্তর্জাতিক স্তরে 'প্রাচ্যের প্রবেশদ্বার' হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে তুলে ধরতে সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবা জোরদার করার পাশাপাশি নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের সাথে আন্তঃসীমান্ত (Cross-border) পর্যটন ও সড়ক যোগাযোগ আরও সহজ ও মসৃণ করা হবে । সামগ্রিকভাবে, ২০২৬-২৭ সালের এই পর্যটন বাজেট বাংলার অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিশ্বমঞ্চে রাজ্যের গৌরবময় সংস্কৃতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে ।





