ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে NCPI রাজনৈতিক দল। এখন আর কেবল দ্বিমুখী রাজনৈতিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই ভারতীয় রাজনৈতিক সমীকরণ । জোট রাজনীতির এই যুগে বড় দলগুলির ভাগ্য নির্ধারণে ছোট বা আঞ্চলিক দলগুলি কিং-মেকারের ভূমিকা পালন করছে। সম্প্রতি ত্রিপুরার এক নেতার হাত ধরে আলোচনায় আসা ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI) এবং এর বর্তমান রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি তারই এক অন্যতম বড় উদাহরণ।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং বিল পাসের সমীকরণ

আগামী বছরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং সংসদে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংবিধান সংশোধনী বিল (যেমন- ‘এক দেশ এক ভোট’ এবং মহিলা সংরক্ষণ বিল) পাস করানোর ক্ষেত্রে শাসক দল বিজেপির জন্য সংখ্যার খেলা অত্যন্ত জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকসভা ও রাজ্যসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (প্রায় ৩৬২ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন) নিশ্চিত করতে এখন প্রতিটি ছোট দলের ভোট অত্যন্ত মূল্যবান। আর ঠিক এই জায়গাতেই NCPI-এর মতো দলের গুরুত্ব নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিক্ষুব্ধ ও আঞ্চলিক নেতাদের নতুন আশ্রয়স্থল

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় বড় জাতীয় বা আঞ্চলিক দলগুলির (যেমন তৃণমূল বা শিবসেনা) ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষের কারণে অনেক বিক্ষুব্ধ সংসদ সদস্য ও বিধায়ক সরাসরি অন্য বড় দলে যোগ না দিয়ে, NCPI-এর মতো দলগুলিকে একটি ‘সুরক্ষিত বিকল্প’ বা আলাদা ব্লক হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এতে দলত্যাগ বিরোধী আইনের জটিলতা এড়ানো যেমন সহজ হয়, তেমনই নিজেদের রাজনৈতিক দর কষাকষির ক্ষমতাও বজায় রাখা যায়। শিবসেনার শিণ্ডে গোষ্ঠী বা এনসিপির শরদ পাওয়ার গোষ্ঠীর মতো ভাঙনের পর এখন NCPI-এর নামও এই তালিকায় উঠে আসছে।

জাতীয় রাজনীতিতে ‘কিং-মেকার’

শাসক শিবিরের অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুযায়ী, সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যার অভাব মেটাতে ব্যাক-চ্যানেল ডিপ্লোমেসি বা ‘অপারেশন লোটাস’ এর মতো রণকৌশলে এই ছোট দলগুলিই প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গ বা তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণে যেখানে ডিএমকে বা বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের সমর্থন নিয়ে টানাপোড়েন চলছে, সেখানে NCPI-এর মতো একটি ছোট দল কেন্দ্রীয় স্তরে সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব কয়েক গুণ বাড়িয়ে নিয়েছে।

বিজেপি নিজেই নিজের প্রতিযোগী তৈরি করছে না তো ?

সাময়িক স্বস্তি: সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে বা কঠিন কোনো বিল (যেমন ‘এক দেশ এক ভোট’ বা সংবিধান সংশোধনী বিল) পাস করাতে গেলে ছোট ছোট দলের জোট বা সমর্থন বিজেপির জন্য অত্যন্ত জরুরি। NCPI-এর মতো একটি নামহীন দলকে রাতারাতি ২০ জন সাংসদের শক্তিতে বলীয়ান করে বিজেপি তার তাৎক্ষণিক লক্ষ্য পূরণ করে নিল।

ভবিষ্যতের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন? রাজনীতিতে কোনো শক্তিই চিরকাল এক জায়গায় স্থির থাকে না। আজ যে দলটির কোনো অস্তিত্বই ছিল না, কাল তারা ২০ জন সাংসদ নিয়ে সংসদের পঞ্চম বৃহত্তম দল হয়ে উঠছে! নীতিগতভাবে যদি এই আঞ্চলিক দলগুলো পরবর্তীতে নিজেদের মাটি শক্ত করতে পারে, তবে তারা বিজেপির এজেন্ডার সামনেই দর কষাকষির (Bargaining power) বড় দেওয়াল তুলে দাঁড় করাতে পারে, ঠিক যেমনটা নীতীশ কুমার বা চন্দ্রবাবু নাইডুর ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যেই দেখা যায়।

পরিশেষে বলা যায়, আদর্শগত লড়াইয়ের চেয়েও এখনকার রাজনীতিতে সংখ্যার গুরুত্ব অনেক বেশি। আর এই সংখ্যার খেলা যতদিন বজায় থাকবে, ততদিন ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে NCPI-এর মতো তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত রাজনৈতিক দলগুলির গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা কেবল বাড়তেই থাকবে।

Democratic Indians Premium